শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০১:৪৪ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ফুলবাড়িয়ায় ব্যবসায়ী সমিতি উপজেলা প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর বৈঠক অসহায় পরিবারের পাশে ফুলবাড়ীয়া উপজেলা যুবলীগ খাদ্য সামগ্রী নিয়ে অসহায়দের বাড়ীতে ইউএনও আশরাফুল ছিদ্দিক ও ইউপি চেয়ারম্যান বাদল করোনা ভাইরাস জনসচেতনতায় ফুলবাড়িয়ায় ব্র্যাকের ৪০জন কর্মী মাঠে করোণা ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনত করতে এনায়েতপুর ইউনিয়নে ছাত্রলীগ সভাপতি করোণা প্রতিরোধে ফুলবাড়িয়া পৌর সভার জীবানুনাশক স্প্রে শুরু ফুলবাড়িয়ায় করোণা প্রতিরোধের আইন না মানায় ৪ব্যবসায়ীর জরিমানা ফুলবাড়িয়ায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে উপজেলা প্রশাসনের চিরুনি অভিযান করোণা ভাইরাস : উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি মো: রফিকুল ইসলাম রাকিব‘র উদ্যোগ করোণা ভাইরাস : মাস্ক ও লিফলেট বিতরণ করলেন পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়া

অভাগিনী মা- বনানী বিশ্বাস

আজ সকালটা কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। ভীষণ গুমোট।ভয়ানক থমথমে একটা অবস্থা!বুঝি এক্ষুনি ধেয়ে আসবে সুনামি। মাথার উপর কাক গুলোর ওড়াউড়ি ভীষণ রকম বিপদ সংকেতের বার্তা দিচ্ছে।প্রতিদিনের চেয়ে আজকের দিনটা একটু ব্যতিক্রম লাগছে অনুর মার কাছে। বুকের ভিতর কিসের যেন দামামা বেজে চলেছে,কিসের যেন অসনিসংকেত!বুকের ভিতর যে কি হচ্ছে তা বলে বোঝানো যাবেনা। আতংকিত অনুর মা দৌড়ে গেল গোয়ালঘরে। তার দুধেল গরুদুটো ঠিক আছেতো? পিতৃহীন অনুর বিশুবিদ্যালয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগায় তার মা এ গরুর দুধ বিক্রি করে। অনুর মা গরু দুটিকে খুব যত্ন করে।গরুদুটি তার লক্ষী। দুটি গরুতে বিশ কেজি দুধ দেয়। এ দুধ বিক্রি করেই সে তার সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালায়।
অনুর মা স্বপ্ন দেখে আরতো মাত্র কয়টা বছর তারপরই অনু চাকরি পাবে। তার এ দুঃখ দুর্দশা কিছুই থাকবেনা। অনুদের সংসারে তার দুটি বোন ও এক ভাই আছে।দুবছর আগে দুরারোগ্য ব্যাধিতে বিনা চিকিৎসায় তার বাবা মারা গেছে। তার মা ভযংকর কষ্ট করে তাদের সংসার চালায়।কতযে স্বপ্ন কল্পনা অনুর মার অনুকে নিয়ে।
নিজগ্রাম দর্শণাতে ভালো স্কুল নেই। শৈশবেই অনু মারাত্মক মেধাবি ছাত্র ছিল। প্রাইমারী স্কুলে সে মেধা বৃত্তি পেয়েছে। তিনকিলো মিটার দূরে শশিকর উচ্চবিদ্যালয়। মাদারীপুর জেলার নামকরা স্কুল এটি। ষষ্টশ্রেণীতে অনু এ স্কুলে ভর্তি হল।শীতের দিনে তিন কিলোমিটার পায়ে হেঁটে সে তার সহপাঠীদের সাথে স্কুলে যায়। বর্ষাকালে এ এলাকার রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায় তখন তারা নৌকায় স্কুলে যায়। নিজেরাই নৌকা চালিয়ে তারা স্কুলে যায়। পড়লেখার প্রতি অদম্য ইচ্ছা শক্তির কাছে তাদের এ পরিশ্রম পরাস্ত হয়। এস এসসি কৃতিত্বের সাথে পাস করে অনু শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়। বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে অনেক খরচ, অনেক প্রাইভেট লাগে। অনুর বাবার এ সামর্থ না থাকায় অনু বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়না। এখানেও সে কৃতিত্বের সাথে পাশ করে। স্কুল কলেজের গন্ডি ছেড়ে সে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালযে সে অর্থনীতি বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পায়।
দারিদ্র ক্লিষ্ট সংগ্রাম মুখর জীবনের শৈশব কৈশোর পেরিয়ে অনু ভরা যৌবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় গন্ডীতে পা রাখে। জীবন এ খানে মুক্ত স্বাধীন।বন্ধু বান্ধবীরা দলবেধে ক্লাসে যায়, কত হুল্লোর করে। অনু তাতে যোগ দিতে পারেনা।ক্লাসে যাওয়ার জন্য তার একটা মাত্র জামা। দুইদিন পড়ার পরে রাতে ধুঁইয়ে পরের দিন সকালে ঐ জামাটাই আবার পড়ে ক্লাশে যায়।বইপত্র কিনতে পারেনা। ক্লাশে সে সবার সাথে মিশতে পারেনা।
তার ভীষণ একা লাগে। কখনযে ঊনিশটি বসন্ত পার হয়ে গেছে সে টেরই পায়নি।শমি বড়লোকের মেয়ে। একদিন সে তার পাশে বসে বলল তুমি সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখ কেন?তুমি এ ক্লাশে সবচেয়ে ভালো ছাত্র। তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে। তুমি আমায় বন্ধু বানাবে? অনু ঘাবড়ে যায়।কি বলবে সে ভেবে পায়না। বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ করে।শমি গাড়িতে আসে গাড়িতে যায়।সে কিনা বলে তাকে তার ভালো লাগে। অনু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কোন জবাব দেয়না।
অনুর বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা খুব অসুস্থ। ডাক্তার দেখাতে পারছেনা। ধুকে ধুকে মরে যাচ্ছে তার বাবা।তার ভীষণ খারাপ লাগছে বাবার জন্য। যাদের সংসারে প্রতিদিন একবেলা খাওয়ার চিন্তা করতে হয় তারপক্ষে পৃথিবীর কোন কিছুই ভালো লাগার নয়।আজও ক্লাশে শমি তার পাশে বসেছে। অনু মেধাবী ছাত্র। অনেকেরই নজর অনুর দিকে।শমি তাকে সহজ করার চেষ্টা করছে। ক্লাশের একটি পড়া শমির কঠিন লাগছে। শমি চায় অনু তাকে পড়াটা বুঝিয়ে দিক।কিন্তু অনু কিছুতেই সহজ হতে পারেনা।আজ তার বাবার কথা খুব মনে পড়ছে।তার মনটা আজ ভীষণ খারাপ।রাত এগরটায় টেলিগ্রাম আসল অনুর বাবা মারা গেছে। অনুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছোট ছোট ভাইবোন, মা কিভাবে চালাবে তার পড়ালেখা। না অনু আর পড়ালেখা করবেনা। বাড়িতে গিয়ে কিছু একটা করে সে তার পরিবারের হাল ধরবে।সে রাতেই অনু বাড়ি চলে গেল।
অনেকদিন হল অনুর মা অনুকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বলছে কিন্তু অনু যাবে কিভাবে?ভেবে পায়না সে কি করবে? তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এগিয়ে এলেন। অনুকে বোঝাল অনেক ছাত্রইতো টিউশনি করে নিজের পড়ালেখা চালায়।সমস্যাতো এখানেই শেষ নয়।অনুর ছোট ছোট ভাইবোন। কে নেবে ওদের দায়ত্ব?আজ সকালে শমির চিঠি পেল সে।শমি লিখেছে সামনেই টার্মিনাল পরীক্ষা অনু যেন খুব তাড়াতাড়ি চলে আসে। অনু যেন বিদ্যুতবেগে শক্তি ফিরে পেল। শমির আহ্বানকে সে উপেক্ষা করতে পারেনা। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যায়।এবার সে দুটি টিউশনি যোগাড় করে।ক্লাশ, টিউশনি সব মিলিয়ে তার ভীষণ ব্যস্ত সময়।সেই সাথে শমির ভালোবাসা তাকে স্রোতের মত টেনে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। নব্বইয়ের দশক। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এসব আন্দোলন অনুকে স্পর্শ করেনা। টিউশনি করে ফিরতে ফিরতে তার অনেক রাত হয়ে যায়। তার মনে পড়ে আগামী কাল শমী তাকে দেখা করতে বলেছে।
অনু সকাল সকাল ক্লাশে গেল।ক্লাশে ছাত্র ছাত্রী নেই বললেই চলে।শমী এসেছে।শমী বলল তুমিতো হলেই থাক।সবদিক খেয়াল রাখ।চারিদিকে আন্দোলন যেভাবে দানা বাঁধছে তাতে ক্লাশ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।সাবধানে থাকবে।আজ সে অনেক্ষণ শমীর সাথে থাকল।শমী আজ তাকে ছাড়তেই চাচ্ছেনা।সন্ধ্যায় তার টিউশনি আছে তাই অনু চলে গেল।রাত দশটার দিকে অনু তখন হলে ফিরছিল।অনুদের হলের সামনেই হল দখল নিয়ে আজ দুইগ্রুপ ছাত্র অবস্থান নিয়ে বসে আছে।সারাদিন বাহিরে থাকার ফলে অনু তা জানতনা।পরিস্থিতি যে এতটা ভয়ানক তা সে বুঝে ওঠার আগেই সে চারিদিকে ভয়ানক চিৎকার শুনতে পেল সাথে সাথে ঝাঁকে ঝাঁকে গোলাগুলি। চারিদিকে অন্ধকার। অনু কিছুই দেখতে পাচ্ছিলনা।হঠাৎ করেই এক ঝাঁক গুলি এসে ঝাজরা করে দিল অনুসহ পাঁচটি তাজা প্রাণকে। অনুর খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে। অনুর ছোটবোনদের কথা। মা কেমন করে ওদেরকে পড়ালেখা করাবে। ছোটবোনটা দাবি করছিল এবার আসার সময় সে একটা থ্রিপিস নিয়ে আসবে ওর জন্য।শমির কথা খুব মনে পড়ছে।শমিকে তার একটু ছুঁইয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। অনু বলল মা আমায় ক্ষমা করো। আমি তোমার স্বপ্ন পূরন করতে পারলামনা। হাসপাতালে শমি ছুটে আসল।
অনুর হাতটি ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।না আর কোন কথা হলোনা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাঁচটি লাশ তাদের নিজ গ্রামে পাঠিয়ে দিল।ভোর রাত থেকে অনুর মা আর ঘুমাতে পারেনা।কি ভয়ানক যন্ত্রণা তার বুকে ভর করছে সে বুঝতে পারেনা। মাথা র উপর কাক ডেকে যাচ্ছে।লাশ নিযে এল গ্রামে। অনুর হেডস্যার অনুর লাশটি গ্রহণ করল।কান্নায় ভেঙে পড়ল তিনি।বললেন অনু তোমাকে আমিই মেরে ফেলেছি।আমি তোমাকে বুঝিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলাম।আমি কি বলব তোমার মাকে।
অনুর লাশ যখন তাদের বাড়ি পৌঁছল তখনকার অবস্থা বর্ণনা করার সাধ্য বিধাতা মনে হয় কাউকেই দেয়নি। তার মা সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে গেছে। সে কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা।কখনও বলছে আমার অনু কতদিন খায়নি আমি ওর জন্য একটু রান্না করে নিয়ে আসি। কখন ও বলছে আমার অনু ঘুমাচ্ছে তোমরা ওকে ডেকোনা। অনুকে নিয়ে কত স্বপ্ন মায়ের। এক দমকা হাওয়া তচনছ করে দিল, ভেঙে খান খান হয়ে গেল মায়ের বুক। অভাগিনী মা তার বাঁচার সব ইচ্ছেটুকু হারিয়ে ফেলেছে। দিকভ্রান্ত পথিকের ন্যায় সে আজ বড্ড অসহায়।

Please Share This Post in Your Social Media

কপিরাইট © ফুলবাড়িয়ানিউজ২৪ ডট কম ২০২০
Design & Developed BY A K Mahfuzur Rahman