ফুলবাড়িয়ায় আগাম সিম চাষে কৃষকের হাসি


প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৫, ২০২৩, ১০:২৫ AM
ফুলবাড়িয়ায় আগাম সিম চাষে কৃষকের হাসি

ডেস্ক রিপোর্ট : ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় সবজি অধ্যুষিত এলাকার তিন ইউনিয়নের অন্তত আড়াইশ কৃষকের স্বপ্ন সিম বাগানে। আগাম সিম চাষে এবং বাম্পার ফলনে কৃষকের হাসি। বাগানে বাগানে সিম ফুলে ভরে উঠেছে। এমন স্বপ্নে ফুরফুরে কৃষকরা মাঠে সময় দিচ্ছেন দিন রাত। ফুলেফুলে ভরা শিম বাগান ঘুরে কৃষকদের সাথে কথা হয় মাঠে মাঠে।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নূর মোহাম্মদ ‘দৈনিক স্বদেশ সংবাদ’ কে জানান, শিম প্রোটিন সমৃদ্ধ একটি সবজি। এর বিচিও সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। তাই দেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আগাম উৎপাদনে কৃষক বেশি লাভবান হয় বিধায় সেদিকে ঝুঁকছে কৃষক। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে অতি মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ। আগাম উৎপাদনে দাম বেশি পেলেও ফলন কম। এটাকে বাম্পার বলা যাবে না। কৃষি বিভাগ উঠান বৈঠক সহ বিভিন্ন মাধ্যমে কৃষকদের সচেতন করার চেষ্টা করছি যাতে তারা কীটনাশক প্রয়োগ করার অন্তত ৫/৭ দিন পর সবজি হারভেস্ট করে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুলবাড়িয়া উপজেলার দক্ষিনাঞ্চলকে আঞ্চলিক ভাষায় পাহাড়িয়া এলাকা বলা হয়। তবে বাস্তবতা হল সেখানে পাহাড় নেই। তবে আছে লাল মাটির উঁচু নিচু জমি। আছে বন বিভাগের জমিও। লাল মাটি অধ্যুষিত জমিতে সারা বছর কৃষকেরা চাষ করেন সবজি। সিম, বেগুন, ভটবটি, করলা, ধুন্দল, কচু ও পেঁপে সহ নানা প্রজাতির সবজি। আনারস ও লেবুর আবাদও বেশ লক্ষ্যনীয়।


বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে বিশাল মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ তার মাঝে ফুটে আছে থোকায় থোকায় লাল খয়েরি রংঙের ফুল। আর ফুলের গোড়ায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিম গাছ। এরই মাঝে স্বপ্ন বুনছেন চাষীরা। কিছুদিন আগের ভারী বৃষ্টি আর জলাবদ্ধায় হাল ছেড়ে দেওয়া শিমচাষীরা অধিক পরিচর্যায় ভাগ্যের চাকা ঘুরার স্বপ্ন দেখতে শুরু করছে। অধিক লাভবান হওয়ার সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন শিম নামক সবজিতে। এরই মধ্যে থোকায় থোকায় ফুলে উকি দিচ্ছে সিম। বাজারে বিভিন্ন এলাকার সিম পাওয়া গেলেও সুস্বাদু ও মজাদার সিম খুব শীঘ্রই (এলাকার দেশিয় নামে পরিচিত) পাওয়া যাবে। তখন দাম থাকবে আকাশ চুম্বি।
উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া, কালাদহ ও বাক্তা ইউনিয়নের সবজি চাষীদের শিমের বাগান চোখে পড়ার মত। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর শিমের বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুরুতে শিমের ফলন কম থাকলেও দাম বেশি থাকে। পরে আস্তে আস্তে ফলন বাড়লে দামও কমতে থাকে। আগাম শিমের বাজার ধরতে কৃষকরাও নানা উপায় খোঁজে। চড়া দামটা ধরতে পারলেই বাম্পার। শিম বিক্রির করে সাম্বলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তারা।

সামান্য জমিতে স্বল্প পুঁজি দিয়েই চাষ করা যায় শিম। আর একটু পরিচর্যা করলেই বেশ মুনাফা অর্জন করা যায় অনায়াসেই। শিমচাষ করে অনেকেই নিজেদের ভাগ্য বদল করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে। আষাঢ় মাসের শেষের দিকে শিমগাছের চারা রোপন করতে হয়। সারিবদ্ধভাবে গর্ত করে তার মধ্যে গোবর জাতীয় জৈব সার দিয়ে কয়েক দিন রাখার পর চারা রোপন করলে স্বল্প দিনেই চারা বেড়ে ওঠে। এর কিছুদিন পর সেচ দিয়ে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে চারা রোপন করতে হয়। চারাগাছ একটু বড় হলেই ক্ষেতে মাচা (জাংলা) বানিয়ে দিতে হয়। সঠিক পরিচর্যা করলে দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যেই শিম গাছে ফুল আসতে শুরু করে। সব মিলিয়ে তিন মাসের মধ্যেই বাজারে বিক্রি উপযোগি হয়। এছাড়াও এ অঞ্চলের বিভিন্ন সড়কের পাশে^ও শিমের বাগান লক্ষ্য করা গেছে। সেখানেও বেশ ফলন হয়েছে। রোপনকারীরা জানিয়েছেন ক্ষেতে লাগানো সিমের আগে সড়কের পাশে^ লাগানো সিমের ফলন আগে হয়।

 

এনায়েতপুরের রাজঘাট এলাকায় সিম বাগানে প্রতিক্রিয়া জানান এক কৃষক।

রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের পাহাড় অনন্তপুর গ্রামের শিমচাষী আব্দল্লাহ (২৮) বলেন, বুঝমান হওয়ার পর থেকেই শিম চাষ করে আসছি। ছোট বেলায় বাপ চাচাদের দেখে শিমচাষ শিখেছেন। এখন নিজের ক্ষেতে নিজেই করেন নানা জাতের সবজি তারমধ্যে শিমচাষ হলো অন্যতম।
একই গ্রামের শিমচাষী আমিরুল ও আব্দুল্ল্যাহ মিলে প্রায় দেড় একর বেগুনের বাগানসহ জমি ২ বছরের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে শুরু করেন সবজিচাষ। লিজ নেওয়া ক্ষেতে বেগুন বিক্রি করেন ৫০ হাজার টাকা পরবর্তীতে একই জমিতে চিচিঙ্গা আবাদ করে বিক্রি করেন প্রায় ৬ লাখ টাকা। এখন সেই জমিতেই আবাদ করছেন শিম। এ ফসলের পর আর একটি ফসল করেই ছেড়ে দিবেন জমি। বর্তমানে এ জমির রোপিত শিমগাছে যে পরিমানের ফুল এসেছে এবং শিমের ছড়া নামছে তাতে বাজার ভাল থাকলে ১০/১১ লক্ষ টাকার শিম বিক্রি করতে করবেন তারা।
বাক্তা ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামে সবজি চাষী সেলিম মিয়া বলেন, আমরা মূলত সবজিচাষী। সারা বছরই আমরা বিভিন্ন প্রকারের সবজি চাষ করে থাকি এ বছর অন্য সবজি বাদ দিয়ে শিমচাষ করে স্বপ্ন দেখছি লাভবান হওয়ার। আমি দেড় একর জমিতে শিম চাষ করেছি। গত বছরও করেছিলাম কিছু লাভও করেছি এবার বাজার ভালা (ভাল), যে পরিমানের ফুল আর শিমের ছড়া (ছোটশিম) ধরছে আল্লাহ যদি কিন্তু (কোন) অসুখ (রোগ) বালাই না হয় তাইলে (তাহলে) মেলা (অনেক) ট্যাহা লাভ অইব (হবে)। বাজারে এহন (এখন) ১২০ ট্যাহা (টাকা) কেজি, বাইত্তে (বাড়ী থেকে) লইয়া যাবো পাইহাররা (পাইকাররা), বাজারে যাওয়া লাগতো না।

কালাদহ গ্রামের সবজি চাষী আঃ গফুর বলেন, আমি আগে বাড়ীর পাছে (পেছনে) পালানের ক্ষেতে ধান লাগাইতাম তেমন একটা ধান হইত না। গত তিন বছর ধইরা (ধরে) সবজি চাষ করি নিজে খাই ও বাজারে বেচি (বিক্রি করি)। এ বছর শিম করছি বাজার ভালা (ভালো) তাকলে (থাকলে) নিজেরা খামু আবার অনেক ট্যাহা বেচপার (বিক্রি) পামু ।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া, কালাদহ ও বাক্তা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশী সবজি চাষবাদ হয়। এ সব ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ১ একর এর উপরে শিমচাষ করেছেন এমন কৃষক রয়েছেন প্রায় ১৫০/১৬০জন। এবছর রবি মৌসুমে উপজেলায় সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২১৪০ হেক্টর। তারমধ্যে (রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত) অর্জিত হয়েছে ১৫৫০ হেক্টর। সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৪৩০ মেঃ টন। এর মধ্যে শিমচাষ করা হয়েছে ৬২০ হেক্টর, সিমের উৎপাদন ধরা হয়েছে ২৩ হাজার ৫৬০ মেঃ টন। যার বর্তমান (১২০টাকা কেজি ধরে) মূল্যে ২৮২ কোটি ৭২ লক্ষ টাকা ।

https://www.bkash.com/