ঐতিহ্যবাহী হুমগুটি খেলায় এবারও চ্যাম্পিয়ান বালিয়ানের মফিজের দল


প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ১৪, ২০১৮, ১০:০২ AM
ঐতিহ্যবাহী হুমগুটি খেলায় এবারও চ্যাম্পিয়ান বালিয়ানের মফিজের দল

মো: আব্দুস ছাত্তার : ফুলবাড়ীয়ায় পৌষের শেষ বিকেলে প্রতি বছরের ন্যায় এবছর জমিদার আমলের তালুক-পরগনার সীমানায় ২শ বছরেরও বেশি ঐতিহ্যবাহি হুম গুটি খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার লক্ষীপুরের বড়ই আটা বন্ধে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া খেলাকে ঘিরে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার লহ্মীপুর গ্রামে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ।


প্রতিবছর খেলা শুরুর আগে লক্ষীপুর বাজার দিয়ে গুটিটি নিয়ে আসা হয় খেলার মাঠে। শনিবার (১৩জানুয়ারি) গুটি নিয়ে আসার সময় বাজারে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় হুড়াহুড়িতে আহত হয় অন্তত ৫জন। সেখানে অবস্থানরত অতিথিবৃন্দ খেলা উদ্বোধনের আগেই গুটি নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায় এবং খেলোয়াররা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গুটির উপর। বিকাল ৪টা হতে রাত ৯টায় পর্যন্ত একটানা খেলা চলে। এ বছর তৃতীয় বারের মতো খেলায় চ্যাম্পিয়ান উপজেলার বালিয়ানের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এড. মফিজ উদ্দিন মন্ডল এর দল।

চ্যাম্পিয়ান দলের নেতৃত্বদানকারী এড. মফিজ উদ্দিন মন্ডল বলেন, ষাঁড় গরু জবাই করে বালিয়ানের সকল খেলোয়ারদের খাওয়ানো হবে।


জানা যায়, পৌষ সংক্রান্তির শেষ বিকেলে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার লক্ষীপুরের বড়ই আটায় তালুক-পরগনার সীমানায় হবে হুমগুটি খেলা। পৌষ মাসের শেষ দিনকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় পহুরা। প্রায় দুইশো বছরের ঐতিহ্যবাহী এই খেলা বছরে একবার একই স্থানে হয়।
পিতলের তৈরি ১ মণ ওজনের গুটি করায়াত্ত করে নিজ গ্রামে নিয়ে গুম করা পর্যন্ত চলে এই খেলা। আর এই খেলাকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার গ্রামে চলে অন্যরকম উৎসাহ উদ্দীপনা। গোটা পরিবেশ হয়ে উঠে উৎসবমুখর। ফুলবাড়ীয়ার লÿীপুর ও দশ মাইলের মাঝামাঝি বড়ই আটা বন্ধে (মাঠে) খেলার কেন্দ্রস্থল। বিকেল চারটার দিকে খেলা শুরু হয়। সকাল থেকে ফুলবাড়ীয়া ছাড়াও পাশ্ববর্তী ত্রিশাল, মুক্তাগাছা উপজেলার লোকজন আসতে থাকে লক্ষীপুর বড়ই আটা বন্ধে।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে লক্ষীপুরের বড়ই আটা বন্ধ। খেলা শুরুর আগে ময়মনসিংহ-ফুলবাড়ীয়া সড়কের অদূরে ভাটিপাড়া, বালাশ্বর, তেলিগ্রামের সংযোগস্থল নতুন সড়কে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।
মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সাথে ত্রিশালের বৈলরের হেম চন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের ভূখন্ডে দুই নীতির প্রতিবাদে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার জন্য লক্ষীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে (যেখানে শুরু তালুক পরগনার সীমানা) সেখানে এই গুটি খেলার আয়োজন করে।
গুটি খেলার শর্ত ছিল, গুটিটি যে দিকে যাবে তা হবে তালুক, পরাজিত অংশের নাম হবে পরগনা। জমিদার আমলের গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়। আজও তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি খেলার গোরাপত্তন। আমন ধান কাটা শেষ, বোরো ধান আবাদের আগে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য জমিদারদের এই পাতানো খেলা চলছে বছরের পর বছর ধরে।

শনিবার জমজমাট হুমগুটি খেলাকে কেন্দ্রকরে ফুলবাড়ীয়ায় মেতে উঠবে লক্ষাধিক মানুষের মিলন মেলা। হুমগুটি উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি এ বি সিদ্দিকের উপস্থিতিতে খেলা উদ্বোধন করা হবে।
এক মণ ওজনের পিতলের গুটি ঢাক ঢোলের তালে তালে নেচে গেয়ে তালুক পরগনার সীমানায় নিয়ে আসে এলাকাবাসী।
প্রতি বছর পৌষের শেষ বিকেলের এ খেলাকে ঘিরে অতি প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষীপুর, বড়ই আটা, ভাটিপাড়া বালাশ্বর, শুভরিয়া, কালীবাজাইল, তেলিগ্রাম, সারুটিয়া, গড়বাজাইল, বাসনা, দেওখোলা, কুকরাইল, বরুকা, ফুলবাড়ীয়া পৌর সদর, আন্ধারিয়া পাড়া, জোরবাড়ীয়া, চৌদার, দাসবাড়ী, কাতলাসেন সহ আশে পাশের ১৪/১৫টি গ্রামে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পড়ে নতুন জামা কাপড়, শতাধিক গরু-ছাগল জবাই হয় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে। গুটি খেলা এক নজর দেখার জন্য দূরদূরান্তের আত্মীয় স্বজনরাও ভীড় জমায় এ গ্রামে।
এ খেলায় থাকে না কোন রেফারীর। আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোন প্রকার বাহিনীর প্রয়োজন হয় না। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেলা। কোন কোন বছর পরদিন পর্যন্ত খেলা চলার রেকর্ডও আছে। একেক এলাকার একেকটি নিশানা থাকে। ঐ নিশানা দেখে বুঝা যায় কারা কার পক্ষের লোক। গুটিটি কোন দিকে যাচ্ছে তা মুলত চিহ্নিত করা হয় নিশানা দেখেই। নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় খেলায়। এভাবে গুটিটি গুম না হওয়া পর্যন্ত চলে এ খেলা।

https://www.bkash.com/