আর্থিক সংকটে চিকিৎসার অভাবে শিকল বন্দি তারেক!


প্রকাশের সময় : জুলাই ১২, ২০২৩, ৫:৫৩ PM
আর্থিক সংকটে চিকিৎসার অভাবে শিকল বন্দি তারেক!

ফুলবাড়িয়া : এই তো কিছুদিন আগেও যে টাকা রোজগার করে দিনাতিপাত করত, সে এখন শিকলবন্দি। ঘরের ভেতর পাঁয়ে শিকল পড়ে ‘ওরিয়’ এবং ঋষিও শব্দসহ নানা শব্দ তার মুখে শুনা যায়। হঠাৎ তারেকের এমন মানসিক অসুস্থতায় অসহায় পরিবার চিকিৎসার ভার নিতে পারছেন না। দিনমজুর বাবা ছেলের কথা মনে করে শুধু শুধু কাঁদেন। আর্থিক সহযোগিতা পেলে চিকিৎসায় আবারও কর্মমুখী হতে পারে তারেক।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার চান্দের বাজার থেকে হাটকালীর বাজারের রাস্তা। পাঁচ কুশমাইল ঈদগাহ মাঠ থেকে একটু সামনে জিয়ার চা স্টল সংলগ্ন তারেক (২১) এর বাড়ী। তার বাবার নাম হাছেন আলী। পেশায় একজন দিনমজুর ৩০০/- রোজ বেতনে একটি সুপারির দোকানে কাজ করেন হাছেন আলী। তারেক দেড় বছর আগেও সুস্থ ছিল। তারেকের শিকলবন্দি জীবন নিয়ে কথা হয় তার বড় ভাই রমজান (৩৫) ও তার এক চাচা খাইরুলের সাথে।

 


হাছেন আলীর প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার সময় রমজান নামের এক ছেলেসহ একমাত্র মেয়ে রেখে যান। দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার সময় তারেক সহ ২ ছেলে ও ১ মেয়ে রেখে গেছেন। তৃতীয় স্ত্রী মারা গেলে ১ ছেলে ও ২ মেয়ে রেখে যান। চতুর্থ স্ত্রীর কোন সন্ধানাদি নেই। বসতবাড়ীর জমিটুকুই আপাতত সম্বল। প্রাথমিক বিদ্যালয় গন্ডি পার হলেই ভালুকজান মোটর সাইকেলের গ্যারেজের কাজে যোগদেয় তারেক। সেটি ছেড়ে প্রায় ৩ বছর আগে ফুফাত ভাই হালিমের সাথে ঢাকার কালিগঞ্জে প্যান্ট তৈরির কারখানায় যায় তারেক। দুই বছর কাজ শিখে নিজেই অন্য একটি দোকানে যোগদেয় সে। সেখানে বছর খানেক কাজ করার পর সম্পর্ক হয় এক মেয়ের সাথে। বাড়ি তার মাদারীপুর। তারেক বাড়িতে এসে অভিভাবকদের বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তারা তারেক কে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলে। তারেক আবারও কালিগঞ্জে যায় এবার বাড়িতে এসে তার মাতলামি শুরু হয়। তার উল্টা পাল্টায় স্বজনরা তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শে প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে ৩২ দিন চিকিৎসা শেষে বাড়িতে আনা হয়। বাড়িতে এসে তারেক বলে তাকে আর ঔষধ খাওয়ানোর দরকার নাই, সে সুস্থ। সে আবারও ঢাকার কালিগঞ্জে যায় সেখানে গিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নারায়নগঞ্জে চলে যায়, পরিবার তাকে না পেয়ে খুঁজাখুজি শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ঈদুল আজহার ৮ দিন আগে তারেক কে নারায়নগঞ্জ থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে স্বজনেরা। কিন্তু তারেক আগের চেয়ে বেশি পাগলামি শুরু করায় প্রতিবেশিরা ভয় পেতে থাকে। সম্প্রতি তারেক ঘরের জিনিসপত্র ভাংচুর করে তার বাবা ও ভাইকে মারতে যায়। এ অবস্থায় তারেকের পরিবার খুবই দু:চিন্তায় পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত জানমাল ক্ষতি ও মানুষের ভয়ে তাকে শিকলবন্দি করা হয়। মানুষের সাহায্য ছাড়া তারেক কে সুস্থ করা যাবে না বলে তার বাবা, ভাই ও পরিবার পরিজনরা জানিয়েছেন।

 


তারেকের বড় ভাই রমযান বলেন, আমাদের বাবা একজন দিনমজুর। দিন আনে দিন খায়, তার সাধ্য অনুযায়ী টাকা দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। তারেক গোসল করতে গেলে পানি থেকে উঠে না। ভালো রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করে না। মাঝে মাঝে বাহির করা হয়। ঘরের পাশে একটি খুঁটিতে শিকল বন্দি করা হয়েছে। সেখানে বিছানা ও বালিশ দেওয়া হয়েছে। তাকে খাবার দাবার দেওয়া হয় সেখানেই। মা নাই, বাবা মানুষের কাজ করে আমি নিজেও গাড়ি চালাই বাড়িতে থাকি না, তাকে নিয়ে আমরা খুব কষ্টে আছি।
তারেকের বাবা হাছেন আলী বলেন, আমার আর কষ্টের শেষ নাই। মা হারা সন্তান অনেক কষ্টে বড় করেছি। আমার চোখের সামনে আমার ছেলে পাগল হয়ে গেছে, বাবা হয়ে আমার আর সহ্য হয় না। আপনাকে মেরেছে কি না জানতে চাইলে বলেন, চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ছেলে কী বাবাকে মারতে পারে? ও বুঝে নাই। যেভাবেই হোকে আমি ওর চিকিৎসা করাতে চাই।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ নাহিদুল করিম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে উপজেলা সমাজসেবা অফিসারকে জানানো হয়েছে।

 

https://www.bkash.com/