ব্রেকিং নিউজঃ-
Home » দেশ » ফতোয়াবাজির কারণে বন্ধ হলো বাউল কণ্যার সঙ্গীত চর্চা

ফতোয়াবাজির কারণে বন্ধ হলো বাউল কণ্যার সঙ্গীত চর্চা

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0

Madhupur pic 02.10.17মো.নজরুল ইসলাম মধুপুর (টাঙ্গাইল) থেকে:বাউল শিল্পীর কণ্যা লাবনী। বাবার হাত ধরে কৈশোরকালেই সঙ্গীত চর্চা শুরু। লেখাপড়ায়ও ভালো। সে টাঙ্গাইলের গোপালপুর সরকারি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অর্নাস পড়ে । বাবা আফজাল হোসেনের বয়স হওয়ায় পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে আর গান গাওয়া হয়না। এজন্য আয়-রোজগারও বন্ধ। জমিজমা বলতে শুধু তিন শতাংশের ভিটে। বড় ভাই মামুন ট্রাক চালায়। বহু আগেই বিয়ে করে পৃথক সংসার মামুনের। বাবা-মা ও বোনের খবর নেয় না। এমতাবস্থায় অনাহারি জনকজননীর মুখে দ’ুমুঠো অন্ন তুলে দিতে ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে পার্ট টাইম জব নেয় লাবনী। পাশাপাশি একটি ফোক গানের দলে ভিড়ে সঙ্গীত চর্চা অব্যাহত রাখে। মঞ্চে দল বেঁধে গান গেয়ে বাড়তি দু’চার পয়সা রোজগার করে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলেও তার গান প্রচার হয়ে। তিনচার মাস পর পর লাবনী গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল আসে বাবামার সাথে দেখা করতে। লাবনীর সঙ্গীত চর্চা নিয়ে গ্রামের মোল্লা শ্রেণির বরাবরই বিরোধীতা ছিল। ওদের সাথে যোগ দেন ক‘জন নিকটাত্মীয়। লাবনীর বাবা-মাকে একাধিবার সতর্ক করা হয় যেন তাদের অবাধ্য সঙ্গীতের ধারেকাছে না যায়। আর কথা না শুনলে তাদেরকে সমাজচ্যূত করা হবে। গত ঈদে লাবনী এক সহশিল্পীকে নিয়ে বাড়িতে আসেন। ওই শিল্পীর সাথে হালকা ঘনিষ্ঠতা ও হাসিঠাট্রা দেখে রক্ষণশীলরা চটে যায়। লাবনীকে নিয়ে নানা কুকথা বলে বেড়াতে থাকে। এর জের ধরে এক শনিবার দুপুরে বড় ভাই মামুন লাবনীকে নাজেহাল করে। গান ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়। গান করলে গলা কেটে হত্যার হুমকি দেয়। গত রবিবার লাবনী জীবনের নিরাপত্তা এবং গান গাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে গোপালপুর থানায় জিড়ি করেন। পুলিশ ওই দিন রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামুনকে থানায় নিয়ে আসে। পরে লাবনীকে গাইতে বাধা দেয়া হবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে মামুন ছাড়া পায়। এ সুযোগে গ্রামের একটি মৌলবাদী মহল গত সোমবার রাতে লাবনীদের বাড়িতে চড়াও হয়। বাবামাসহ লাবনীকে ও লাঞ্জিত করে। গত মঙ্গলবার দুপুরে ফতোয়াবাজরা ফরিদুল ইসলামের বাড়িতে সালিশী বৈঠক ডাকে। সেখানে লাবনী ও তার বাবামাকে ডাকা হয়। গান গাওয়ার জন্য লাবনীকে চরিত্রহীন আখ্যা দেয়া হয়। পরে একশ টাকার সাদা স্ট্যাম্পে লাবনী ও তার বাবামার টিপসই ও দস্তখত নেয়া হয়। মৌখিক তিন শর্তে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। শর্ত হলো লাবনী কোনো দিন সঙ্গীত চর্চা করতে পারবেনা। পর্দা মেনে চলতে হবে। ঢাকায় নয় বাড়িতেই অবস্থান করতে হবে। লাবনী অভিযোগ করেন, ওই বৈঠকে সঙ্গীত চর্চার অভিযোগে সবার সামনে তাকে চরিত্রহীন আখ্যা দিয়ে ভৎসর্ণা করা হয়। লাবনী বলেন, গান তার প্রাণ। গান তার ধ্যান। রক্তে হয়েছে গানের সুর। আর সেই সুর গলায় তুলতে না পারলে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে সে। লাবনীর বাবা আফজাল হোসেন অভিযোগ করেন, মেয়েটাকে গান গাওয়া বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভয়ভীতি দেখিয়ে মুচলেকা নেয়া হয়েছে। আমার চালচুলো নেই। সারা জীবন গান গেয়ে সময় পার করেছি। মারপিট আর মুচলেকার ভয়ে মেয়েটাকে সঙ্গীত চর্চা বন্ধ রাখতে বলেছি। তাকে বাড়ি ছেড়ে যেতে ও মানা করা হয়েছে। এভাবে গানের পাখিকে ওরা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। মেয়েটা নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। কখন আত্মহত্যা করে বসে সেই ভয়ে তটস্থ রয়েছি। এ ব্যাপারে গ্রামের সমাজপতি এবং ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আলহাজ ফরিদুল ইসলাম জানান, গ্রামের লোকেরা চান না লাবনী গান করুক। কারণ গান গাইলে মেয়েদের চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। মুচলেকা নেয়ার সত্যতা স্বীকার করে তিনি জানান, লাবনী পর্দানশীন হয়ে এবং চরিত্র ঠিক রেখে গান গাইলে গ্রামবাসির আপত্তি নেই। লাবনীর চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, গ্রামবাসির ধারনা লাবনী পর পুরুষের সাথে গলা মিলিয়ে গান গাইতে অভ্যস্ত হওয়ায় তার স্বভাবচরিত্র ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তাই সময় থাকতে তাকে সাবধান করা হয়েছে। এটি কোনো অন্যায় নয়। এ ব্যাপারে ঝাওয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, ওই গ্রামের মানুষ চায় না মেয়েরা ঘরে বা বাইরে গান করুক। তারা খুবই রক্ষণশীল। লাবনী যাতে আরো নির্যাতিত বা কোনঠাসা না হয় সে জন্য গ্রামবাসিকে হুশিয়ার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিলরুবা শারমীন জানান, এ ডিজিটাল যুগে এমন অভিযোগ বা আচরণ সত্যিই বিস্ময়কর। লাবনীকে গত সোমবার অফিসে ডেকে আনা হয়েছিল। তাকে নির্ভয়ে সঙ্গীত চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য বলা হয়েছে। কেউ বাধা দিলে বা ফতোয়া দেয়ার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Related posts:

About fulbaria

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*